অজানা ভয়, গুগল ম্যাপ আর একা পথচলা: আমার ট্রাভেলার হয়ে ওঠার শুরু

আমার জীবনের প্রথম বিদেশ সফর ছিল ২০১৫ সালের আগস্টে। তবে সেটা ট্রাভেল বলা যাবে না, কারণ সেটা ছিল হজের জন্য। তখন গ্রুপে যাওয়া, সবকিছু নির্দিষ্ট, নিজে কিছু ভাবার দরকার ছিল না। তাই নিজেকে কখনোই ট্রাভেলার মনে হয়নি।

কিন্তু ২০১৭ সালের মে মাসে যে সফরটা হয়, সেটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম সত্যিকারের ট্রাভেলিং অভিজ্ঞতা। একজন সলো ট্রাভেলার হিসেবে, চারটা দেশ ঘোরা। এই যাত্রাটাই আমাকে বদলে দিয়েছে।

সবকিছু হঠাৎ করেই শুরু হয়। আমার এক ইউকে ক্লায়েন্ট আমাকে ইউকে যাওয়ার জন্য ইনভাইট করেছিল, ফুল স্পনসরশিপসহ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ২০১৭ সালে আমার ইউকে ভিসা রিজেক্ট হয়। মনটা তখন ভেঙে গিয়েছিল।

এরপর তারা বলল, ইউকে না হলে ব্যাংককে এসে দেখা করতে। তারাও ব্যাংককে আসবে। তখন আবার নতুন করে ভিসার চিন্তা। ট্রাভেল এজেন্সির সাথে কথা বললাম। তারা বলল, যদি আগে দুই–তিনটা দেশের ট্রাভেল হিস্ট্রি না থাকে, তাহলে থাইল্যান্ড ভিসা পাওয়া কঠিন হবে।

সেখান থেকেই পুরো ট্রিপের প্ল্যান দাঁড়ায়। আগে মালয়েশিয়া টুরিস্ট ভিসা, কারণ তখন কোনো ট্রাভেল হিস্ট্রি লাগত না। সেই ভিসার উপর ভিত্তি করে সিঙ্গাপুর ভিসা, তারপর এই দুইটা দেখিয়ে থাইল্যান্ড ভিসা। আমি সব অ্যাপ্লাই করলাম, আলহামদুলিল্লাহ সব ভিসাই হয়ে গেল।

টিকিট কাটার সময় ট্রাভেল এজেন্ট সাজেশন দিল, চাইলে ইন্দোনেশিয়াও অ্যাড করা যায়। মালয়েশিয়া থেকে খরচ কম, আর তখন ইন্দোনেশিয়া ভিসা ফ্রি ছিল। একটু ভেবে রাজি হয়ে গেলাম।

শেষ পর্যন্ত প্ল্যান দাঁড়াল—
সিঙ্গাপুর ২ রাত,
মালয়েশিয়া ৩ রাত,
ইন্দোনেশিয়া ৩ রাত,
আর ব্যাংকক ৩ রাত।

সিঙ্গাপুরে হোটেল খরচ বেশি, তাই দুই রাতই রাখা হলো। যদিও সব খরচ আমার ক্লায়েন্ট দিচ্ছিল, তবুও অযথা অপচয় করার ইচ্ছা ছিল না। সব মিলিয়ে টিকিট বাবদ প্রায় ৫০ হাজার টাকা পেমেন্ট করেছিলাম।

হোটেল আমি নিজেই বুক করেছিলাম Agoda থেকে। তখন থেকেই আমি আগোডা ব্যবহার করি। এখনো করি। মাঝেমধ্যে ইউএসএ গেলে Booking.com ব্যবহার করেছি, আর গত বছর ইউএসএ আর কানাডায় Airbnb-ও ব্যবহার করেছি।

এই ট্রিপটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম সলো ট্রাভেল। সবকিছুই নতুন। এয়ারপোর্ট, ইমিগ্রেশন, কানেক্টিং ফ্লাইট—সবকিছু প্রথমবার নিজের মতো করে।

ঢাকা এয়ারপোর্টে প্রথম ট্রাভেলার হিসেবে কোনো ঝামেলা হয়নি। সৌদি যাওয়ার সময় ফ্লাইটের কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি, কারণ সেটাই ছিল প্রথম ফ্লাই। কিন্তু এবার সবকিছু খেয়াল করছিলাম। ইন-ফ্লাইট খাবার, ইনফোটেইনমেন্ট—সবকিছু এনজয় করা শুরু করলাম।

ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে সরাসরি মেট্রোর দিকে গেলাম। সিঙ্গাপুরের এমআরটি সিস্টেমটা ভীষণ সহজ আর পরিষ্কার। টিকিট নেওয়া থেকে শুরু করে ট্রেন ধরা—সবকিছুই পরিষ্কারভাবে লেখা, সাইন বোর্ড এত ভালো যে প্রথমবার গেলেও কনফিউজ হওয়ার সুযোগ কম।

গুগল ম্যাপ অন করে মেট্রো ধরলাম, হোটেলের কাছের স্টেশনে নামলাম। ভাড়া খুব বেশি না, কিন্তু যে কমফোর্টটা দেয়—ওটা অনেক দেশের চেয়েও ভালো। স্টেশন থেকে হেঁটে হোটেলে যাওয়ার সময় বুঝলাম, এই শহরটা হাঁটার জন্যও কতটা ফ্রেন্ডলি।

হোটেলের নাম ছিল প্রাইম হোটেল। খুব বেসিক একটা হোটেল। তখন এসব ব্যাপারে আমার তেমন ধারণা ছিল না। বাংলাদেশ এরিয়া, লোকেশন—এই জিনিসগুলো তখন বুঝতাম না। কম বাজেটের মধ্যেই বুক করেছিলাম।

মেরিনা বে এরিয়া ছিল আমার কাছে সবচেয়ে ইমপ্রেসিভ। মেরিনা বে স্যান্ডসের উপরের অবজারভেটরি ডেকে উঠেছিলাম। ওপর থেকে পুরো শহরটা দেখে মনে হচ্ছিল—এটা শুধু শহর না, এটা একটা প্ল্যান করা আর্ট। নিচে নদী, পাশে বিল্ডিং, দূরে আলো—সব মিলিয়ে একদম সিনেমার দৃশ্য।

জায়ান্ট হুইলে ওঠার অভিজ্ঞতাও আলাদা ছিল। ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে উঠতে পুরো শহরটা চোখের সামনে খুলে যাচ্ছিল। মারলিয়ন পার্কে গিয়ে প্রথমবার সিঙ্গাপুরের সেই আইকনিক দৃশ্যটা সামনে থেকে দেখলাম। ছবি তুললাম, কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলাম।

সিঙ্গাপুর জু আর নাইট সাফারি ছিল একদম ভিন্ন অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে নাইট সাফারি। অন্ধকারের মধ্যে গলফ কারে বসে একদম কাছ দিয়ে বাঘ আর সিংহ চলে যাচ্ছে—কোনো খাঁচা নেই। আমাদের গাইড আগেই বলে দিয়েছিল, ফ্ল্যাশ জ্বালানো যাবে না। ওই মুহূর্তে ভয় আর উত্তেজনা একসাথে কাজ করছিল।

সেন্টোসা আইল্যান্ডে প্রথমবার কেবল কারে উঠেছিলাম। তখন সত্যি সত্যি ভয় লাগছিল। আমি একাই ছিলাম কেবিনে। নিচে সমুদ্র, ওপরে ঝুলে থাকা কেবল—মনে হচ্ছিল ছিঁড়ে পড়বে না তো? কিন্তু একটু পর সেই ভয়টাই রোমাঞ্চে বদলে গেল। চারপাশের ভিউটা এত সুন্দর ছিল যে চোখ ফেরানো কঠিন।

সিঙ্গাপুরে যাতায়াত নিয়ে আলাদা করে বলতেই হয়। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এতটাই কনভিনিয়েন্ট যে আলাদা গাড়ির দরকার পড়ে না। আর যদি দরকার হয়, উবার বা ওই টাইপের রাইডে যেসব গাড়ি আসে, সেগুলো বেশিরভাগই নতুন মডেলের, পরিষ্কার, আর চালকরাও প্রফেশনাল। ভাড়া তুলনামূলক একটু বেশি মনে হতে পারে, কিন্তু সার্ভিসটা সেই অনুযায়ী।

এই দুই দিনে সিঙ্গাপুর আমাকে শিখিয়েছে—একাই চলা যায়, শুধু একটু সাহস আর প্ল্যানিং দরকার। গুগল ম্যাপ আর নিজের উপর ভরসা থাকলে অজানা শহরও ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে যায়।

এভাবেই শেষ হলো আমার সিঙ্গাপুর পর্ব। অজানা ভয়, নতুন অভিজ্ঞতা আর গুগল ম্যাপের উপর ভরসা করে এগিয়ে চলা।

এরপর শুরু হলো পরবর্তী দেশের যাত্রা…

✍️ লেখক পরিচিতি

MD ABDUL HAKIM MIAH
Proprietor, B M Aerospace

আমি একজন উদ্যোক্তা, সলো ট্রাভেলার এবং অভিজ্ঞতা লিখে রাখতে ভালোবাসা একজন মানুষ। ভ্রমণের পথে শেখা ছোট ছোট গল্প আর বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলোই আমার লেখার মূল শক্তি।

🌐 Website: https://bmaerospace.com
📝 Blog: https://blog.bm-aerospace.xyz/
📘 Facebook: CREATEWITHBABU
📸 Instagram: CREATEWITHBABU
▶️ YouTube: CREATEWITHBABU


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *