আসসালামু আলাইকুম 🌸
চুলার পাশে এসে বসুন… আজ বানাবো খিরশা (Khirsha)—যেটা শুধু মিষ্টি না, আসলে ধৈর্য আর দুধের গল্প।
🌾 খিরশা কী? — একটু গল্প আগে
খিরশা আর সাধারণ পায়েস এক না।
পায়েসে চাল, চিনি, এলাচ—সবাই সমান কথা বলে।
কিন্তু খিরশা মানে দুধই রাজা।
আগে গ্রামে বা জমিদার বাড়িতে, বড় হাঁড়িতে দুধ বসত চুলায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল দিয়ে দুধ নামানো হতো অর্ধেকেরও কমে। তারপর অল্প চাল, অল্প মিষ্টি—ব্যস।
এই খিরশা বানানো হতো বিয়ের আগের রাতে, নবজাতকের মুখে ভাতের দিনে, বা খুব সম্মানিত অতিথির জন্য।
✨ কেন খিরশা আলাদা
- চাল খুব কম, দুধ খুব বেশি
- ঘন, মাখনের মতো টেক্সচার
- রং হালকা অফ-হোয়াইট
- মুখে দিলে দুধের গভীর মিষ্টি গন্ধ
- ঠান্ডা হলে আরও সুন্দর হয়
🥛 উপকরণ (৪–৫ জনের জন্য)
- ফুলক্রিম দুধ – ২ লিটার
- গোবিন্দভোগ চাল – ৩ টেবিল চামচ
(না পেলে বাসমতি, তবে গোবিন্দভোগই আসল) - চিনি – ½ কাপ (স্বাদমতো কমবেশি)
- এলাচ – 3–4টা (হালকা থেঁতো)
- তেজপাতা – ১টা (ঐচ্ছিক, পুরনো কায়দা)
- কাজু বা কিশমিশ – সামান্য (ঐচ্ছিক)
👉 নোট: খাঁটি খিরশায় অনেক সময় বাদামই দেওয়া হয় না।
🔥 রান্নার আগে জরুরি কথা
- হাঁড়ি ভারী তলার হতে হবে
- আঁচ সবসময় মাঝারি থেকে কম
- নাড়ার সময় ধৈর্য লাগবে—এইটাই আসল মসলা
- প্রেশার কুকার ❌ (খিরশার শত্রু)
🍚 প্রস্তুতি
- চাল ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন
- ভিজে গেলে হাত দিয়ে হালকা মথে নিন
👉 চাল ভাঙা থাকবে, গুড়ো না
👩🍳 রান্নার ধাপে ধাপে গল্প
ধাপ ১: দুধ বসানো
হাঁড়িতে দুধ ঢেলে মাঝারি আঁচে বসান।
ফুটতে শুরু করলে আঁচ কমিয়ে দিন।
👉 নাড়তে থাকুন, বিশেষ করে তলায়—দুধ লেগে গেলে খিরশার রং নষ্ট হবে।
ধাপ ২: দুধ নামানো
৪৫–৬০ মিনিট ধরে দুধ জ্বাল দিন।
দুধ যখন প্রায় অর্ধেক হয়ে ঘন হবে, তখন—
👉 ওপরে যে সর (malai) উঠবে, সেটা তুলে আবার দুধেই মিশিয়ে দিন।
এইটাই খিরশার মাখন ভাব আনে।
ধাপ ৩: চাল দেওয়া
এবার ভাঙা গোবিন্দভোগ চাল দিন।
আঁচ একদম কম।
১০–১৫ মিনিট ধীরে ধীরে নাড়ুন।
👉 চাল ফুলে যাবে, কিন্তু আলাদা দানা থাকবে না।
ধাপ ৪: মিষ্টি আর গন্ধ
চিনি দিন, এলাচ আর তেজপাতা দিন।
⚠️ চিনি দেওয়ার পর খিরশা পাতলা লাগবে—ভয় পাবেন না।
আরও ১০ মিনিটে আবার ঘন হবে।
ধাপ ৫: শেষ স্পর্শ
চামচ তুললে যদি ধীরে পড়ে—তখনই নামান।
👉 বেশি জ্বাল দিলে শুকিয়ে যাবে।
❌ সাধারণ ভুল ও সমাধান
- দুধ কেটে গেছে → আঁচ বেশি ছিল
- খিরশা পাতলা → সময় কম জ্বাল
- চাল দলা → চাল ভালোভাবে ভাঙা হয়নি
- রং হলদে → তলায় লেগেছে
👅 স্বাদ ঠিক করার টিপস
- বেশি মিষ্টি হয়ে গেলে → ২ টেবিল চামচ গরম দুধ মেশান
- কম ঘ্রাণ → ১ ফোঁটা গোলাপ জল (ঐচ্ছিক)
- আরও ঘন চাই → ঢাকনা ছাড়া ৫ মিনিট
🍽️ পরিবেশন
- মাটির বাটিতে দিলে স্বাদ দ্বিগুণ
- হালকা ঠান্ডা বা একদম ফ্রিজ ঠান্ডা
- আলাদা করে কিছু লাগেই না
🕰️ সংরক্ষণ ও পরদিনের স্বাদ
- ফ্রিজে ২ দিন ভালো থাকে
- পরদিন আরও ঘন ও গভীর স্বাদ
- গরম করবেন না—খিরশা ঠান্ডাতেই রাজা
🌙 শেষ কথা
খিরশা তাড়াহুড়োর মিষ্টি না।
এইটা বানাতে হয় সময় দিয়ে, মন দিয়ে।
যেদিন খিরশা ঠিকমতো জমে—সেদিন রান্নাঘরটা একটু নীরব, একটু শান্ত হয়ে যায়।
Leave a Reply